এক শিক্ষক-বাবার আর্তনাদ ও মনুষ্যত্বের পরীক্ষা

ট্রেনটি কোয়াত কোয়াত শব্দে থেমে গেল। ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনে উঠেই দেখি আমার উল্টো দিকে এক বৃদ্ধ মাথা নীচু করে বসে আছেন। মনে হলো তিনি অসুস্থ। ট্রেনের টিটি টিকেট চেক করছিল।  টিটিকে টিকিট দেখাতে না পেরে ভদ্রলোকের চোঁখে মুখে এতটাই অপরাধী ভাব যেনো এক  খুনের মামলার আসামী। টিটির অকথ্য ভাষার গালাগালি  আর অপমানসূলভ আচরণ আমি এড়িয়ে যেতে পারছিলাম না। একটু উচ্চ ভাষায় বলে ফেললামঃ “টিটি সাহেব, একজন বৃদ্ধ মানুষের সাথে ভালো মতো কথা বলুন। ফাইনসহ কত টাকা? আমি দিয়ে দিচ্ছি।”

টিটি বললোঃ  আপনি দেবেন কেনো? উনিতো বিনা টিকেটে উঠেছেন। এটা অপরাধ।

আমিঃ অনেক অপরাধ হয়তো দেখা যায় না। বয়সটাতো বুঝতে হবে। যা হোক, তাতে আপনার কি? টাকা নিয়ে রশিদ কেটে দিন।

রশিদটা বৃদ্ধের হাতে দিয়ে বললামঃ বাবা, রশিদটা রাখুন। পথে আবার লাগতে পারে।

কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধ বললোঃ বাবা তুমি আমার আমার মান সন্মান বাঁচালে। না হলে কী যে হতো!

পরিস্থিতি স্বাভাবিকের জন্য মৃদু হেঁসে বললামঃ আপনি ঢাকায় কোথায় থাকেন?

বৃদ্ধ বললোঃ না বাবা, আমি ঢাকায় থাকি না।

আমিঃ তাহলে কার কাছে যাচ্ছেন?

বৃদ্ধ বললোঃ সে এক ইতিহাস বাবা। আপনার কি শোনার সময় হবে?

আমিঃ  অবশ্যই, বলুন, তবে তার আগে আমাকে অবশ্যই তুমি বলে ডাকবেন।

বৃদ্ধ বললোঃ  আমি পাইকপাড়া বশিরউদ্দিন স্কুলে বিএসসি শিক্ষক ছিলাম।

তিনি তাঁর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।

স্যারঃ  বাইশ বছর পর শিক্ষক শব্দটি শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বললামঃ  স্যার, আপনার গল্পটা বলুন।

স্যারঃ তিন বছর বয়সের যমজ দুটো ছেলে হয়েছিল। পরে আর  একটি মেয়ে জন্মের সময় ওদের মায়ের মৃত্য হলো। সন্তানদের দিকে তাঁকিয়ে আর বিয়ে করলাম না। পাইকপাড়ায় মাথা গুঁজার ঠাঁই করি। সন্তানদেরকে বাবা-মায়ের আদর দিয়ে বড় করলাম। বড় ছেলেটা বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলো। ছোট ছেলেটা ঢাকা মেডিক্যাল থেকে পাশ করলো।”

আমিঃ  মেয়েটি ?

স্যারঃ “নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজনের ধারনা মেয়েকে লেখা পড়া শিখিয়ে লাভ কি? পরের বাড়ী চলে যাবে। বরঞ্চ ছেলেকে সুশিক্ষিত করে তুললে বৃদ্ধ বয়সে একটু মাথা গুঁজার ঠাঁই হবে। আমার ধারণাও সেরকই হয়েছিল। আমরা খুব স্বার্থপর জাতিরে বাবা। মেয়েটি ইন্টারমিডিয়াট করার সাথে সাথে বিয়ে দিয়ে দিলাম। ছাত্রীও ভালো ছিলো।

আমিঃ তারপর?

স্যারঃ ছেলে দুটোকে উচ্চ ঘরে বিয়ে করালাম। ছেলে দুটোর অনুরোধে জমিটুকু বিক্রী করে বড় ছেলে পল্টনে আর ছোট ছেলে উত্তরায় ফ্ল্যাট কিনলো।

আমিঃ মেয়েকে কিছুই দেন নাই?

কাঁদতে কাঁদতে স্যারঃ  সেটাই ছিল একটা বিরাট ভুল। ছেলের বৌদের সিদ্ধান্ত মতে প্রতি মাসের ১ হতে ১৫ তারিখ বড় ছেলের বাসায় আর ১৫-৩০  তারিখে ছোট ছেলের বাসা সুটক্যাস নিয়ে ছুঁটাছুটি। মেয়ে অবশ্য বহুবার বলেছে আব্বা আপনি আমার কাছে চলে আসেন। কোন মুখ নিয়ে যাবো? কতদিন যাবৎ বুকের বাম দিকটা ব্যথা করছে। শুনলে মেয়েটাও কষ্ট পাবে।

আমিঃ ডাক্তার দেখাননি?

মৃদু হেঁসে স্যারঃ ডাক্তার আবার, ছোট বৌমাকে বললাম আর কয়েটা দিন থাকি। সে সুটকেসটা বাহিরে ফেলে দিয়ে ইংরাজীতে বললো সেটা সামনে মাসে থাকবেন। কষ্ট করে বড় ছেলের বাসায় গিয়ে দেখি তালা মারা। দাড়োয়ান বললো ওরা দু সপ্তাহের জন্য মালোয়েশিয়া গেছে। তারা জানে নির্ধারিত সময়ানুযায়ী আমার আসার কথা। হয়তো ভুলেই গেছে। পকেটে বিষ কেনার পয়সাও নেই। তাই ভাবলাম মেয়েই শেষ অবলম্বন।

আমিঃ মেয়ে কি করে?

স্যারঃ  জামাইটা আমার খুব ভালো। ওকে শাহজালাল থেকে কম্পিউটার সায়েন্স এ পড়িয়ে ওরা দুজনই এখন প্রাইভেট ব্যাঙ্কে আছে।

আমিঃ এমন অবস্থায় আপনার মেয়ে যদি আপনাকে গ্রহণ না করে?

স্যারঃ মেয়ের পায়ে ধরে কান্না করলে  আমাকে তাঁড়িয়ে দেবে না। সম্মানের চেয়ে বেঁচে থাকা বেশি দরকার বাবা।

আমিঃ এতো আত্মবিশ্বাস? মেয়ে কি জানে আপনি আসছেন?

স্যারঃ না, আমারতো মোবাইল নেই।

আমিঃ নম্বর দিন, কথা বলিয়া দিচ্ছি।

স্যারঃ “না না বাবা, মোবাইলেতো মেয়ের পা ধরে মাফ চাইতে পারবো না। আগেই যদি নিষেধ করে দেয়!

আমি একটি চেষ্টা করে দেখি। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার মেয়ে কোন দিন এমন কথা বলবে না।

এক প্রকার জোর করেই ফোন ডায়রী দেখে স্পিকার অন করে ডায়াল করলাম-

আমিঃ “হ্যালো, আমি রফিক বলছিলাম। ট্রেনের মধ্যে বসে থেকে। আমি শাহানা নামের একজনের সাথে কথা বলতে চাই। আপনি কি শাহানা বলছেন?

শাহানাঃ জ্বী বলছি। বলুন?

আমিঃ একখানা সুখবর দেওয়ার জন্য ফোন করলাম।

শাহানাঃ কিসের সুখবর?

আমিঃ কিছুক্ষণের মধ্যে আপনার বাবা অর্থাৎ স্যার রেল স্ট্যাশনে পৌঁছাবেন।

মেয়েটি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলোঃ এই শুনছো, আব্বা আসছেন। চলো আমরা স্টেশনে যাই। কতদিন হয় আব্বাকে দেখি না। নিবিড় চল বাবা, তোর নানা ভাই আসছে, চল স্টেশনে যাই।

কিছুক্ষণ পর স্টেশনে ট্রেনটি ধীর গতিতে চলতে চলতে থেমে গেল। জানালা দিয়ে তাঁকিয়ে দেখলাম। ঘরের সাধারণ কাপড় পড়া স্বামী-সন্তানসহ এক নারী অধীর আগ্রহে তাকিয়ে যাত্রী খুঁজছিলো। তাঁকানো দেখেই বুঝে গিয়ে স্যারকে বললামঃ স্যার, উনি আপনার মেয়ে?

স্যার বেশ নার্ভাস স্বরে বললোঃ  হ্যাঁ আমার, মা।

আমি ইশারা দিতেই ওরা দরজার সামনে আসলো। স্বামী স্যারের ভাঙ্গা সুটকেসটা নিয়ে ডান হাতটা ধরে নামাতে চেষ্টা করল। মেয়েটি এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলো। স্যারের চোখ ভরা অশ্রু আমাকে বিদায় দিলো। ট্রেন আবার ছুটতে লাগলো। মেয়ে,জামাই আর নাতি স্যারকে ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে যাচ্ছে আর ট্রেনটির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলো।

মেয়েটির কান্না দেখে মনে হলো মা তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে বহুদিন পর ফিরে পেলো।

জানালা দিয়ে দূর দিগন্তের দিকে  তাকিয়ে ভাবছিলামঃ আজ আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই আনন্দ থেকে আমিও বঞ্চিত হতাম না।

Spread the love
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    23
    Shares

Abul Bashar

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

নব্য সরকারি বিদ্যালয়ের আদর্শ হতে পারে যে বিদ্যালয়ঃ বিভাগের সেরা বিদ্যালয়

শুক্র জানু ২৪ , ২০২০
স্ত্রী ও তিন বোনকে – শুরুটা খুব কঠিন ছিল চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ছাত্রছাত্রী ছিল না, শিক্ষকও না। কারণ কে-ইবা আসবে সেই স্কুলে পড়তে, যেখানে কোনো শিক্ষক নেই! আর কে-ইবা চাইবে সেই স্কুলে শিক্ষক হতে যেখানে পড়াতে হবে বিনা বেতনে? কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা এই স্কুলটিই […]
  • পিটিআই সংলগ্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার জন্য যদি শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হয় তাহলে শিক্ষক সংযুক্ত করা যাবে। ডিপিএড শিক্ষার্থী যারা চতুর্থ টার্মে রয়েছেন এবং পিটিআই ক্যাচমেন্ট এলাকার বাহির থেকে ভর্তি হয়ে এসেছেন বা অন্যত্র হতে বদলী হয়ে এসেছেন তাদের সংযুক্ত করা যাবে। পরিপত্র ডাউনলোড করুন এখান থেকে Spread the love15       15Shares

  • বিনা বেতনে নিয়ে চলেছেন ক্লাস – যে বয়সে মানুষ অবসরে থাকেন, জীবনের শেষ বেলার সময় গোনেন। সেই সময়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজি শেখাচ্ছেন ৯০ বছর বয়সী শিক্ষক কাঞ্চন আলী সিকদার। তিনি একজন মুক্তি’যো’দ্ধা। বয়স ৯০ বছর হয়ে গেছে। ৩৬ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এরপর অবসরে […]

  • (এমন শিক্ষার্থী যেন জম্ম নেয় ঘরে ঘরে—-) টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে জমানো টাকা – মহিমা ও মাকসুদা দুই বোন। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তারা। টানা দুই সপ্তাহ তাদের বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারণে খোঁজ নিতে তাদের বাড়িতে আসে সহপাঠীরা। গত কিছুদিন ধরে তাদের মা অসুস্থ। বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছে। এরই মধ্যে স্বজনরা নিয়ে যায় […]

  • 1. The problem The problem is a number one tremendous problem for the present era of science and technology. This so-called problem is gradually on the increase to such a great extent that people of our country suffer most from it. It, no doubt, creates numerous troubles and anxieties in […]

  • নির্দেশনামূলক Classroom Language for whole class Everybody listen to me. Take your English book. Listen and say after me. Take your book. Read after me. Write in your exercise book. Present your work to the class. দলীয় কাজে নির্দেশনামূলক ভাষা Each 5 make a group. Each bench make a group. […]

of

of